প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস

অবহেলিত উত্তর বঙ্গের পশ্চাদপদ, মঙ্গাপীড়িত কুড়িগ্রাম জেলার অধীনস্থ এক অতি প্রাচীন জনপদের নাম উলিপুর। আজকের বিংশ শতাব্দীর দ্বার প্রান্তে দাঁড়িয়ে বিশ্ব সভ্যতার সাথে তাল মিলিয়ে আমরা উলিপুরবাসী আজ যতটুকু অগ্রসর ও অগ্রগামী হইয়াছি তার মূলে রহিয়াছে মহারাণী স্বর্ণময়ী। সেই প্রগতি ও ক্রমবিকাশের কথা বলতে গেলে যাদের অবদান সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য তাদের মধ্যে মহিয়সী মহারাণী স্বর্ণময়ীর নাম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বিরাজ করছে আমাদের অন্তরে। বিশেষ করে শিক্ষা, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণমূলক ক্রমবিকাশে ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করিলে তাঁর অবদান উলিপুরের পরিসীমা ছাড়িয়ে দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বের ইতিহাসে স্থান পাবার দাবী রাখে।
ইতিহাস থেকে জানা যায় ১৭৫৭ সালের পূর্বে ছোট্ট একটি ‘মুদির দোকান’ করতেন একজন অতি সাধারণ লোক নাম তার কান্ত মুদি। (আসল নাম কান্ত) মুদির দোকান করতেন বলে নাম হয় কান্ত মুদি। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ইংরেজদের বিরোধ হওয়ায় নবাব কাশিম বাজারে ইংরেজ কুঠি আক্রমণের আদেশ দেন। আক্রমণকালে ওয়ারেন্ট হেস্টিংস, মতান্তরে লর্ড ক্লাইভ (কারো মতে হেস্টিংস, কারো মতে লর্ড ক্লাইভ) জীবন বাঁচানোর জন্য কান্ত মুদির নিকট আশ্রয় গ্রহন করেন। কান্ত মুদি তার ধানের ডোলার ভিতর তাঁকে লুকিয়ে রেখে তার জীবন রক্ষা করেন। তিনি চলে যাওয়ার সময় নিদর্শন স্বরূপ কান্ত মুদিকে একটি আংটি উপহার দেন। কথিত আছে ১৭৭২ সালে লর্ড ক্লাইভ/হেস্টিংস ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর গভর্নর নিযুক্ত হলে কান্ত মুদি সেই নিদর্শনের আংটিটি হেস্টিংসকে দেখালে তিনি খুব খুশি হন এবং রাণী ভবানীর কাছ থেকে বাহারবন্দ জমিদারী কেড়ে নিয়ে কান্ত মুদিকে উপহার হিসেবে ইজারা প্রদান করেন। পরবর্তীতে ১৭৭৭ সালে তাঁর পুত্র লোকনাথ নন্দীর নামে বার্ষিক ৮২,৬৩৯ টাকা জমায় বাহারবন্দ, ভিতরবন্দ ও গয়াগাড়ি পরগণা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করিয়া দেন।
কান্ত মুদির মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র লোকনাথ নন্দী জমিদারী পরিচালনা করেন। কিন্তুু দুর্ভাগ্যক্রমে মাত্র ২৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হলে তাঁর পুত্র কৃষ্ণকান্ত নন্দী জমিদারী লাভ করেন। কৃষ্ণকান্ত নন্দী ছিলেন একজন শিক্ষিত, জ্ঞানী, অভিজ্ঞ এবং রুচিবান জমিদার। তিনি গভর্নর জেনারেল অর্কল্যান্ডের নিকট হইতে বাহাদুর উপাধি লাভ করেন। কালক্রমে তিনি এক মামলায় জড়িয়ে পড়েন। কথিত সূত্রে জানা যায় ১৮৪৪ সালে ৩১ অক্টোবর তিনি আত্মহত্যা করেন। এই কৃষ্ণকান্তের স্ত্রী ছিলেন মহিয়সী মহারাণী স্বর্ণময়ী। তাঁদের কোন পুত্র-সন্তান না থাকায় ব্রিটিশ সরকার তাঁদের জমিদারী বাজেয়াপ্ত করেন। স্বামীর আগ্রহে ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মহারাণী স্বর্ণময়ী বাংলা লিখতে, পড়তে ও অংক কষতে শিখেছিলেন। যাহা পরবর্তীতে জমিদারী পরিচালনার জন্য সহায়তা করেছিল।
সেই সময় একজন নারী হয়েও তিনি জমিদারী উদ্ধারের জন্য কোলকাতার হাইকোর্ট ও সুপ্রীম কোর্টে মামলা পরিচালনা করেন। কিন্তুু এতে তিনি ব্যর্থ হন। অবশেষে ইংল্যান্ডের পি.পি কাউন্সিল থেকে কৃষ্ণকান্তের উত্তরসূরী হিসাবে তিনি জমিদারীপ্রাপ্ত হন। একজন নারী হয়েও তিনি সেই সময়ে দীর্ঘদিন মামলা পরিচালনা করিয়া জমিাদারী পুনরুদ্ধার করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
মহারাণী স্বর্ণময়ী এই পশ্চাৎপদ জনপদের অশিক্ষিত মানুষগুলোকে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য ১৮৬৮ সালে তিনি উলিপুরে ‘উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়’ নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। যাহা উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয় নামে সবার সুপরিচিত। বর্তমানে উহা উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী স্কুল এন্ড কলেজ নামে খ্যাত। একজন নারী হয়েও তিনি শিক্ষার যে গুরুত্ব উপলব্ধি করিতে পারিয়াছিলেন বলেই তাঁর এই উদ্দ্যোগ আজও প্রশসংসনীয়।

জনকল্যাণমূলক কাজঃ
সাধারণ মানুষ যাতে বিনা চিকিৎসায় মারা না যায় তারজন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘কাশিম বাজার স্টেট দাতব্য চিকিৎসালয়’ যা সকলের কাছে সরকারী ডাক্তারখানা নামে পরিচিত।  ইহা ছাড়াও উলিপুর উপজেলার বর্তমান যে ‘থানা পুলিশ অফিস’ সেই জায়গাটিও বৃটিশ সরকারের অনুরোধে মহারাণী স্বর্ণময়ী দান করেন।
জমিদারী প্রথা আজ বিলুপ্ত হইয়াছে কিন্তুু মহারাণী স্বর্ণময়ী স্কুল এন্ড কলেজ আজও স্বমহিমায় তারই স্মৃতি বহন করিয়া চলিতেছে। তাহা ছাড়া কাচারী বাড়ীর সামনের স্বর্ণময়ী পুকুর আজ মনোরম পার্কে পরিণত হইয়াছে। জমি-জমা সংক্রান্ত কাগজপত্রাদি সংগ্রহ করার রেকর্ড রুম আজ মহিলা ডিগ্রী কলেজের ছাত্রী নিবাস হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইহা ছাড়াও ‘গোবিন্দ জীউ মন্দির ও নাট্য মন্দিরে’ আজও চলমান রহিয়াছে নাট্য চর্চা।
সেই মহিয়সী রমনী আজ বেঁচে নেই। কিন্তুু তিনি যে শিক্ষার আলোক বর্তিকা ছড়াইয়ে  গিয়াছেন তা তাঁকে অমর করে রাখবে চিরকাল। একজন নারী হয়েও সেই সময়ে উলিপুরের মানুষের জন্য শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও শৃঙ্খলার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তাতে তিনি শুধু উলিপুরে নয় সমগ্র বাংলাদেশে একজন অনন্য মহিয়সী রমনী হিসাবে বেঁচে থাকবেন চিরদিন।   ধন্যবাদ-

Print Friendly

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী স্কুল এন্ড কলেজ © 2015